জুমুআ: রবের খাস নেয়ামত

একজন মু’মিন বান্দার জীবনে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি লাভের চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে? পার্থিব জীবনের নিত্যদিনের ব্যস্ততা, ক্লান্তি এবং দুনিয়াবি ডামাডোলের মাঝে জুমুআর দিনটি আসে পরম করুণাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ খাস নেয়ামত ও পবিত্র উপহার হিসেবে। সপ্তাহের শেষপ্রান্তে এসে এই দিনটি মু’মিনকে সুযোগ করে দেয় পুরো সপ্তাহের আত্মিক ক্লান্তি ও পাপাচারের ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে রবের দরবারে নতুন করে সমর্পিত হওয়ার। এই দিনের মর্যাদা বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দিনটিকে মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০৯৮)
অন্য হাদিসে নবীজী (সা.) আরও বলেছেন,
"এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা—এ দুইয়ের মধ্যবর্তী সময়ের গোনাহগুলোর জন্য কাফফারা স্বরূপ, যদি কবিরা গোনাহ করা না হয়।" (সহীহ মুসলিম)।
জুমুআ হলো এক আত্মিক রিচার্জের দিন, যেখানে বান্দা তার রবের সান্নিধ্যে এসে নিজের গোনাহ মাফ করায় এবং আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে।
এই সুমহান নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যেই জুমুআর দিনের বিশেষ আমলগুলোকে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে। সকাল থেকেই পরিচ্ছন্নতার সুন্নাত পালনের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয় গোসল করা, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার ও মিসওয়াক করা বান্দাকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে রবের মেহমান হওয়ার যোগ্য করে তোলে। এরপর দূরবর্তী ব্যস্ততা ভুলে জুমুআর ডাকে সাড়া দিয়ে মসজিদের দিকে পা বাড়াতে হয়।

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন:
"হে মুমিনগণ! যখন জুমুআর দিনে সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় বর্জন করো। এটিই তোমাদের জন্য পরম কল্যাণকর, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে পারো!" (সূরা আল-জুমুআ, ৬২:৯)
ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সালাফ তথা পূর্ববর্তী বুজুর্গগণ জুমুআর বরকত অর্জনের জন্য কেবল শুক্রবার সকালেই প্রস্তুতি নিতেন না, বরং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই তারা জামাকাপড় পরিষ্কার করে ও ইস্তিগফার করে মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করতেন। জুমুআর দিনে নীরবে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শ্রবণ করা, সূরা আল-কাহফ তেলাওয়াত, প্রিয় নবী (সা.)-এর ওপর অধিক দরূদ পাঠ এবং আসর-উত্তর দোয়া কবুলের বিশেষ সময়ে ইবাদতে মগ্ন থাকার মাধ্যমেই বান্দা আল্লাহর সর্বোচ্চ নৈকট্য অর্জন করতে পারে।
তবে এই জান্নাতী আনন্দ ও আত্মিক উন্নতি কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা একজন মু’মিনের দায়িত্বের পূর্ণতা নয়। মু’মিন নিজে যেমন আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী, তেমনি তার প্রিয়জনদেরও এই পরম কল্যাণের অংশীদার করতে ভালোবাসে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দায়িত্ববোধের তাগিদ দিয়ে বলেছেন:
"তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল এবং তোমরা সকলেই নিজ নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।" (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
তাই জুমুআর দিনের বরকত অর্জনে নিজের পাশাপাশি পরিবার, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের উৎসাহিত করা অত্যন্ত জরুরি। ঘরে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই জুমুআর দিনে গোসল করা ও সুগন্ধি ব্যবহারের সুন্নাত শেখানো, পরিবারের সকলকে সাথে নিয়ে দরূদ পাঠ ও সূরা কাহফ তেলাওয়াতের আবহ তৈরি করা এবং বন্ধু-বান্ধবদের আগেভাগে মসজিদে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া একটি ঈমানী পরিবেশ তৈরি করে।
জুমুআর দিনকে কেবল একটি সাধারণ ছুটির দিন হিসেবে না দেখে একে রবের দেওয়া এক পরম উপহার হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। যখন একটি পরিবারের সবাই এবং সমাজের প্রতিটি মানুষ জুমুআর এই সুন্নাত ও আমলগুলোর প্রতি যত্নবান হবে, তখন আমাদের গৃহ ও সমাজ আল্লাহর রহমত ও বরকতে প্লাবিত হবে। প্রতি সপ্তাহের এই বিশেষ দিনে রবের সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে যে আত্মিক শক্তি অর্জিত হয়, তাই মূলত একজন মুমিনকে সারা সপ্তাহ সঠিক পথে চলার ও সফল জীবন গড়ার নতুন আলো জোগায়।
আল্লাহ্ আমাদেরকে জুমুআর হক আদায় করার তৌফিক দান করুন, আমিন।


